কক্সবাজার কথা

সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো:আলীর জীবনের গল্প

সোহাগ আমিনুল:চট্টগ্রাম

“আমারও একটি গল্প আছে”

ছুটি নিয়ে দুই বন্ধু ব্যাগ গুছিয়ে হাঁটা শুরু করলাম আরকান রোড হয়ে।কক্সবাজার পৌছাতে দেখা হল রাজেশের সাথে।র‍্যাব-০৯এর হয়ে রাজেশ এখানে এসেছে মাদক বিরোধী অভিযানে।তার কাছে নিজ এলাকার এক গাদা বদনাম শুনে আবার বাসে উঠলাম।
দুইটা নাগাদ আমরা হ্নীলায় পৌছলাম।
পশ্চিম আকাশে বিকেল ফেরানোর আগে দেখা পেলাম স্যারের, আমার শৈশব কাটানো বেড়িবাঁধে।রেজা শুরু করে দিলো একের পর এক প্রশ্ন।
মিলিটারি কি আপনাকে খুন করতে চেয়েছিল?কেন চেয়েছিল?আপনার অনেক সাহস ছিল না স্যার?
স্যার ছল ছল চোখে থমকে দাড়ায় হঠাৎ।স্যার কিছুইতে বলছেনা ইতিহাস।আমি ও রেজা নাছোড়বান্দা গল্প শুনবোই।
অবশেষে স্যার মুখ খুললো নাফ নদীর পূর্ব দিকে আঙ্গুল তোলে
:-সময় গুলো পার হচ্ছিলো খুব বিভীষিকাময়,মায়ানমারে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেছে।
রেজা স্বভাজাতেই নক কুটতে কুটতে বলল
‘তো স্যার যোগাযোগ হতোনা?’
স্যার হাতের উল্টো পিঠে চোখ ঘষে বলল
“যোগাযোগ বলতে ছোট্ট একটা রেডিও ছিল,সারাক্ষণ আমাদের পাশে রাখতাম। ০৬ই ডিসেম্বর সকালে রেডিও চালু করতে আবেগে আপ্লুত হলাম।”
আমি চোখ বড় বড় করে বলে বসলাম
‘স্যার নিশ্চয় কোন খুশির খবর পড়েছে সংবাদে’
“হুম, তুমি ঠিকই বুঝেছো,ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে বিজয়ী স্বীকৃতি দিয়েছে ভূটান ও ভারত,বিজয়ের আনন্দ তখন বাংলার রুক্ষ আকাশ জুড়ে।রক্তের গন্ধে বয়ে যাওয়া বাতাস টানে বুক ভরে বাঙালী।”এক বুক দীর্ঘ শ্বাস রেখে চুপ হয়ে গেলেন স্যার।
কথা বলতে বলতে আমরা তখন ২নং স্লুইসগেট পার হয়ে গেছি। রেজার ইচ্ছার কাছে হেরে গিয়ে আমরা টঙের দোকানে বসে চা’য়ে চুমুক দিই।স্যার শুরু করেন গল্পের বাকিটা “নিউজ শেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের রেজাল্ট ঘোষনা করছিলো,একটার পর একটা রোল নং বলে যাচ্ছিলো।ফার্স্ট ক্লাসে ঘোষনা হলো আমার রেজাল্ট। দেশ স্বাধীন একদিকে অন্য ভালো রেজাল্টের খুশিতে চোখ দিয়ে অবিরত পানি ঝরছিল।বরাবরের মতো হাতের উল্টো পিঠে জল মুছিনি।ঝরুক কান্নার জল,এ কান্না আনন্দের কান্না,এ কান্না বিজয়ের কান্না।”এই বলে স্যার আবার হাঁটা শুরু করলেন এই যেন ১৮’র যুবক।আমরাও পিছু নিলাম শেষ না শুনে ছাড়ার মানুষ আমরা না।
“দেশে আসার জন্য দুজনে নৌকা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলাম,নাফের বুকে নৌকা ভাসায় হেয়্যো তোলে।মাঝ নদীতে এসে আবার ফিরে গেলাম মায়ানমারে”
আমি বলে উঠলাম
“ফিরে গেলেন কেন স্যার ”
রক্তলাল চোখে বলতে শুরু করলেন আবার”মাঝ নদীতে আসতেই শুরু হয় বৃষ্টির মতো গোলা বর্ষন, হ্নীলা পুরাতন বাজার মসজিদের মিম্বর ছিল তাদের ঘাঁটি।
আমি আমার জীবনে দুইবার কেঁদেছি, একবার আনন্দের কান্না আরেক বার বুকের ভিতরকার চাপা কষ্টের কান্না।যেদিন আমার মা মৃত্যুবরণ করেন”
এই বলে স্যার চুপ হয়ে রইলেন।হঠাৎ আকাশের দেয়ালে কি খুঁজতে চেষ্টা করলেন…
অধ্যাপক মোঃ আলীর জীবনের গল্প শুনতে শুনতে আমাদের চোখ ভিজে গেছে কবে কেউ খেয়াল করিনি।
হে বাঙালী স্যালুট আপনাকে( অধ্যাপক মোঃ আলী)।

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close
Close